নতুন করে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কায় উদ্বেগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো

সুদহার কমিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।

সুদহার কমিয়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন শীর্ষ অর্থনীতির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। তারা বলছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগামী বছর সুদহার কমিয়ে আনার গতি ধীর হতে পারে। এদিকে অর্থনীতির এ পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারে। খবর ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা সামনের দিনগুলোয় সুদহার কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এতে ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের দাম কমে গেছে। ফলে ইল্ড (মুনাফা) বেড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশে পৌঁছে, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে ইল্ড দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।

সাধারণত বন্ডের ইল্ড দামের বিপরীতে চলে। অর্থাৎ দাম বাড়লে ইল্ড কমে, দাম কমলে ইল্ড বাড়ে। সুদহার ও মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসের সঙ্গে বন্ডের দামে পরিবর্তন আসে।

যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ড (বিওই) কর্মকর্তারা গত বৃহস্পতিবার মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এর বাড়তি ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে ব্যাংকটি। এতে দেশটির বন্ডের ইল্ড ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কয়েক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক নীতিগুলো বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরো বাড়িয়ে তুলছে।

রাসেল ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ অ্যান্ড্রু পিজ বলেন, ‘মুদ্রানীতি শিথিল করার গতি মূল্যস্ফীতি না কমা পর্যন্ত অনেক ধীর হবে, যা নিয়ে বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন।’

একে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মূল্য নিয়ন্ত্রণ প্রচেষ্টার ‘শেষ ধাপের চ্যালেঞ্জ’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা সুদহার কমানোর গতি কমিয়ে দিতে পারে, এ উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বন্ড বাজারে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় বিক্রি বেড়েছে। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক নীতি শিথিল করলেও তা আরো সমস্যা তৈরি করতে পারে।

ফেড গত বুধবার সুদহার কমানোর পর মার্কিন পুঁজিবাজারে পতন দেখা যায়। তবে আগামী বছর আগের পূর্বাভাসের তুলনায় সুদহার কমানোর ধীরগতির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকরা সুদহার কমানোয় সতর্কতা অবলম্বনের কথা বললেও বিপরীত সুরে কথা বলছে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি)। ইসিবি গত সপ্তাহে বলেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির দিন শেষ হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে সুদহার কমানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিনিয়োগকারীরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় মুদ্রানীতি শিথিল করার ব্যাপারে প্রত্যাশা কমিয়েছেন। অক্টোবরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিওই আগামী বছরে চারবারের পরিবর্তে দুবার ২৫ বেসিস পয়েন্ট করে সুদহার কমাবে বলে প্রত্যাশা করছেন তারা। অন্যদিকে ফেড আগামী বছর একবার সুদহার কর্তন করবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দুবার সুদহার কমানোর ৫০ শতাংশ সম্ভাবনাও দেখছেন তারা। যদিও এক মাস আগে দুবার কর্তনের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন বিনিয়োগকারীরা।

ফেড কর্মকর্তারা গত বুধবার আগামী বছরে দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট সুদহার কমানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন। তিন মাস আগেও তারা ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানোর পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সতর্কতার কারণ ট্রাম্পের সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির নীতি, যা করপোরেট কর হ্রাস, উচ্চ শুল্কের দিকে ইঙ্গিত করে।

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি ছিল। এ অবস্থা ফেডের সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে যৌক্তিকতা প্রদান করেছে। ফেড কর্মকর্তারা গত বুধবার আগামী বছরের জন্য মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও বাড়িয়েছেন, যা এ উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে।

বৃহস্পতিবার বিওই সুদহার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। দেশটির নীতিনির্ধারকরাও মূল্যস্ফীতির উচ্চ ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিওই ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনার উল্লেখ করে বলেছে, বাণিজ্য নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতির ওপর এর প্রভাব শিগগিরই বোঝা যাবে না।

বিওইর নয় সদস্যের মুদ্রানীতি কমিটির তিনজন তাৎক্ষণিক সুদহার কমানোর কথা বলেছিলেন। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তা অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ছিলেন।

বিওইর গভর্নর অ্যান্ড্রু বেইলি বলেন, ‘‌অর্থনীতিতে বাড়তি অনিশ্চয়তার কারণে আগামী বছরে কখন বা কতটা সুদহার কমানো হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’

আরও